Monday, December 25, 2023

জলবাগানে হাতেখড়ি পর্ব - ১ - অঙ্গন আমার প্রকৃতি


জলবাগান মানে জলজ গাছ যেমন পদ্ম, ওয়াটার লিলির মতো গাছ নিয়ে ফুলের বাগান। প্রথম পর্বে সার সংক্ষেপ। পরের পর্ব গুলোতে ডিটেলস।

    এই পর্বের উদ্দেশ্য যাতে আপনি খুব তাড়াতাড়ি একদম বেসিকটা শিখে ফেলতে পারেন আর একদম নতুন হলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে এই গাছগুলো আপনার জন্য সঠিক কিনা।

১) পদ্ম ,ওয়াটার লিলিকে আমরা জলের গাছ বললেও মিডিয়া ( মাটি, সার) দরকার। যদি রাইজম এর মধ্যে অনেক খাদ্য সঞ্চিত থাকে তাহলে শুধু জলে একটা দুটো ফুল পেলেও পেতেও পারেন , কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী ভালো গাছ এর জন্য মাটি, সার দুটোই দরকার।

২) পদ্ম বা ওয়াটার লিলির ভালো গাছ হওয়ার জন্য, ফুল হওয়ার জন্য দিনের মধ্যে যেকোনো সময় কমপক্ষে ৩/৪ ঘণ্টা সরাসরি সূর্যালোক বা সারাদিন উজ্জ্বল আলো ,এর যেকোনো একটা প্রয়োজন। ছায়া জায়গায় গাছ হবে , কিন্তু কিছু স্পেসিফিক ভ্যারাইটি ছাড়া ফুলের দেখা পাবেন না।
বাড়ির ছাদে সব ভ্যারাইটি করতে পারবেন , ফ্ল্যাট বারান্দায় করলে সিলেক্টিভ ভ্যারাইটি করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৩) ইনডোরেও এই গাছ করতে পারেন , তবে তার জন্য দিনে আঠারো ঘণ্টা ফুল স্পেকট্রাম গ্রো লাইট, ওয়াটার হিটার , স্পেসিফিক ভ্যারাইটি আর কঠোর পরিশ্রম লাগবে। এক্সপেরিমেন্টালি করতে চাইলে ওয়েলকাম, নতুনদের জন্য স্ট্রিকটলি "না"।

       খোলা আকাশের তলায় , সারাদিন আলো বাতাস পেলে এই গাছ সবথেকে সহজে হয়।

৪) পদ্ম ,ওয়াটার লিলি অত্যন্ত হার্ডি গাছ । কিছু বেসিক জিনিস জেনে নিলে এই গাছ অমর। যেকেউ এই গাছ করতে পারবেন , এমনকি কেউ জীবনে অন্য কোনো গাছ না করলেও এই গাছ করতে পারবেন। জবা বা গোলাপ এর তুলনায় হাজার গুনে সহজ এই গাছ করা। তাই করতে পারবেন কি পারবেন না এটা ভাববেন না।

৫) ভেজা মাটিতেও ( জমা জল ছাড়া ) এই গাছ হবে আর ফুলও দেবে। তবে প্রতিদিন জল দিতে হবে যাতে মাটি শুকিয়ে না যায়। 
      দু/তিন ইঞ্চি জল সবসময় ধরে রাখলে সপ্তাহে একবার জল দিলেই যথেষ্ট। জলে ৩/৪ টে দেশি guppy মাছ ছেড়ে দিলে সারা বছর মশার লার্ভা একটাও দেখতে পাবেন না।  

৬) বাড়ি তালা দিয়ে দিন দশেক কোথাও ঘুরে আসতে পারেন। ভালো করে জল দিয়ে গেলে গাছের কোনো সমস্যা হবে না। তাই বেড়াতে গেলে গাছের কি হবে এই টেনশন থেকে মুক্তি, এটলিস্ট এই গাছের জন্য।

৭) ভালো করে বসিয়ে দিলে , এই গাছের প্রতিদিন পরিচর্যার দরকার পড়ে না। জল কমে গেলে জল দিলেই এই গাছ সুন্দর থাকে। আপনি ব্যস্ত মানুষ হলে এই গাছ আপনার জন্য।

৮) এই গাছে পোকামাকড় খুব কম লাগে। স্পেসিফিক সিজনে জাবপোকা(aphids) হয় , একদিন তামাক পাতা ভেজানো জল দিলেই আবার পরিষ্কার হয়ে যায়।  
       অনেকের গাছে মিলিবাগ , লাল মাকড় হতে দেখি , তবে আলেকালে । আমার গাছে কোনোদিন এগুলো দেখিনি। এগুলো হলেও Actara একদিন স্প্রে করলেই চলে যাবে। এই গাছে সাবান বা শম্পু গোলা জল কখনো স্প্রে করবেন না।

৯) বীজ থেকে গাছ করলেও গাছ হবে আর ফুল ও দেবে। কিন্তু কবে দেবে কোনো গ্যারান্টি নেই। চার মাসেও ফুল পেতে পারেন , আবার চার বছরেও ফুল নাও পেতে পারেন। কি ভ্যারাইটির বীজ, আর কতো বড়ো জায়গায় বসিয়েছেন তার ওপর নির্ভর করবে কতদিনে ফুল আসবে বা আদৌ আসবে কিনা। বিজের গাছের ফুল , মা গাছের ফুলের থেকে একটু হলেও আলাদা হবে।

       রাইজম বা কন্দ থেকে গাছ করলে ৪৫ দিনের মধ্যে গাছ হয়ে ফুল চলে আসবে। নতুনরা রাইজম বা কন্দ থেকেই প্রথমবার গাছ করুন , তাড়াতাড়ি ফুল পেলে উৎসাহ টা থাকবে। যাঁরা অলরেডি একবার হলেও ফুল পেয়ে গেছেন , তারা চাইলে এক্সপেরিমেন্টালি বীজ থেকে গাছ করতে পারেন।

     দশকরমার দোকান থেকে কেনা বীজ সাধারনত ইন্ডিয়ান নেটিভ পিঙ্ক/হোয়াইট পদ্মের বীজ হয়। এগুলো ছোটো জায়গায় খুব কম ফুল দেয়। প্রথমবার করলে দশকরমার দোকান থেকে বীজ না কেনাই ভালো।

১০) নীল পদ্ম হয় না, তাই ফ্লিপকার্ট বা আমাজন এ নীল পদ্মের বীজের আইটেম দেখে কিনে এনে নীল পদ্ম পাবেন এরকম আশা না রাখাই ভালো। বীজ এর গাছে কি ফুল ফুটবে আর কবে ফুটবে এটার গ্যারান্টি ভগবান ও আপনাকে দিতে পারবেন না।

১১) আমাদের দেশের আবহাওয়াতে রাইজোম কেনার আর গাছ বসানোর আদর্শ সময় মার্চ থেকে আগস্ট । সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই সময় রাইজোম কিনতে পারেন , গাছ বড়ো করতে পারেন , তবে গাছ ফুল দেবে মার্চ থেকে আগস্ট। কিছু ভ্যারাইটি অক্টোবর এও ফুল দেয়, তবে সব ভ্যারাইটি দেয় না 

     সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই সময় রাইজোম কিনলে সেলার এর গাইডেন্স নিয়ে গাছ করুন। 

১২) পদ্মের রাইজোম বা কন্দ তুললে দু সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে স্প্রাউট করে যায়, এর পর না বসালে ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে । তখন সেটাকে বিক্রি করার মতো অবস্থায় থাকে না । 
     এই কারণের জন্য নার্সারী গুলো কমার্শিয়াল ভাবে পদ্মের রাইজোম বা কন্দ প্রোডাকশন করতে আগ্রহী না। এতো কম সময়ের মধ্যে বিক্রি করার মতো নেটওয়ার্ক সবার থাকে না, তাছাড়া মোটামুটি সবাই একই সময় কন্দ তোলে ।

    এই কারণে দেখবেন নার্সারী গুলোতে অন্য গাছ খুব সহজলভ্য হলেও পদ্ম বা ওয়াটার লিলি খুব কম পাওয়া যায়। যে একটা দুটো নার্সারী তে পাওয়া যায়, ভ্যারাইটি খুব কম ।

     পদ্মের রাইজোম বা কন্দ কেনার সবথেকে ভালো রাস্তা যাঁরা এই গাছ করেন তাদের অনেকেই কন্দ তুললে সেল করেন। এনাদের থেকে নিতে পারেন। বিশ্বাস করেন এরকম কারো থেকে কন্দ নিন, প্রথম কদিন গাইড করবেন কিনা জেনে নেবেন। প্রথম গাছ করলে প্রথম কদিন কারো গাইডেন্স নিয়ে গাছ করলে ভালো হয়।

১৩) পদ্মের ভ্যারাইটি গুলো মোটামুটি দু ভাগে ভাগ করা যায়। ট্রপিক্যাল আর হার্ডি। অধিকাংশই ভ্যারাইটি হার্ডি আর ট্রপিক্যাল এর সংকরায়ণ এর ফলে তৈরি , তাই পিওর ট্রপিক্যাল বা পিওর হার্ডি জিন টেস্ট ছাড়া বোঝা সত্যি মুস্কিল।

       তাই হার্ডি বা ট্রপিক্যাল এর মধ্যে না গিয়ে , কোন ভ্যারাইটি ভালো ফুল দেয় আর তাড়াতাড়ি ফুল দেয় এটা দেখে কিনুন। কিছু ভ্যারাইটি জুলাই এ বৃষ্টির জল না পেলে ফুল দেয় না , এগুলো মার্চে কিনলে পাঁচ মাস পাতা দেখে কাটাতে হবে। তাই কেনার সময় ভ্যারাইটি দেখে কিনুন।

১৪) শুধু গোবর সার আর মাটিতেও সুন্দর গাছ হয় আর ফুল ও দেয়। গোবর সার টা এক বছরের পুরানো হলে ভালো আর মাটি টা এঁটেল মাটি হলে ভালো। গোবর সার না পেলে ভালো ভার্মিকম্পোস্ট ও নিতে পারেন ।
        গাছের গ্রোথ হিসাবে ব্যালান্সড npk, DAP, লাল পটাশ , হিউমিক অ্যাসিড , সিউইড, মাইক্রো নিউত্রিএন্ট এসব দিতে পারেন , তবে এসব ছাড়াও খুব সুন্দর গাছ হয়।
আমি বসানোর সময় পরিমাণ মতো সব দিয়ে বসিয়ে দি, সারা বছর মাটিতে আর কিছু দিই না ।

    কাঁচা গোবর আর দোআঁশ মাটিতেও দুর্দান্ত গাছ হয় আর ফুলও হয়, তবে এতে রিস্ক অনেক বেশি। সব ভ্যারাইটি এই মিডিয়া নিতে পারে না। কাঁচা গোবর অনেক স্ট্রং বলে একটু বেশি হয়ে গেলেই কন্দ পচে যাবে, গাছের পাতা পুড়ে যাবে। তাই আপনি অভিজ্ঞ না হলে এই মিডিয়া তে যাবেন না । এই মিডিয়াতে গাছ দাড়িয়ে গেলে যেকোনো মিডিয়ায় গাছকে বলে বলে দশ গোল দেবে ।

 ১৫) বেলে মাটি ছাড়া যেকোনো মাটিতে এই গাছ খুব ভালো হয়। আপনার মাটি এই গাছের জন্য উপযুক্ত কিনা জানার সহজ উপায় হলো আপনার মাটি জলে ভালো করে ভিজিয়ে হাতের মুঠো করে ছেড়ে দিলেও যদি ডেলা না ভাঙ্গে , সেই মাটি ঠিক আছে ।

     সারসংক্ষেপ: সবমিলিয়ে পদ্ম, ওয়াটার লিলি খুব সহজে হয়, যেকেউ করতে পারবেন , বাড়ির ছাদে বা বারান্দাতেও হবে, বেড়াতে গেলেও ঝামেলা করবে না, প্রতিদিন পরিচর্যা করতে হবে না আর খুব কম সময়ের মধ্যে ফুল পেয়ে যাবেন । 
      মোটামুটি একটা বেসিক ধারণা বোধহয় আপনাদের দিতে পেরেছি । পরের পর্ব গুলোতে এক একটা দিক ডিটেলস এ আলোচনা করবো ।যেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো একটা লিস্ট দিলাম, কিছু স্কিপ করে গেলে কমেন্টে জানাবেন।

১. পদ্ম/ওয়াটার লিলির ভ্যারাইটি ।
২. মিডিয়া প্রস্তুতি।
৩. কন্দ কিভাবে বসাবেন।
৪. পরিচর্যা কিভাবে করবেন ।
৫. রোগবালাই ও তার প্রতিকার ।
৬. রিপট কিভাবে করবেন।
৭. শীতকালীন পরিচর্যা।

   স্ট্রেস মাল্টিপ্লিকেশন,লং ডিউরেশন প্রিসারর্ভেশন, হাইব্রিড তৈরি এগুলো আপাতত লিস্ট এর বাইরে। এগুলো অ্যাডভান্সড টপিক , হাতেখড়িতে এগুলো নেই ।

কোনো প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় কমেন্টে জানাতে পারেন। জানা থাকলে উত্তর দিতে চেষ্টা করবো ।

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ ছবিতে দেখা যাচ্ছে পেয়ারার ফলের ভেতরের অংশ কালো হয়ে পচে গেছে এবং...