Friday, December 29, 2023

গোলাপ গাছের পাঁচ পাতা /সাত পাতা , এলা ডালের গল্প - অঙ্গন আমার প্রকৃতি

গোলাপ গাছের পাঁচ পাতা /সাত পাতা , এলা ডাল রাখবেন না কেটে ফেলে দেবেন ? বুঝবেন কি করে কোনটা এলা ডাল ?

    শখের ছাদবাগানেই বলুন বা ফ্ল্যাট এর একচিলতে বারান্দায় , আর কিছু থাকুক না থাকুক একটা গোলাপ গাছ না হলে ঠিক যেন মন ভরে না।

 আসলে ফুলটাই এমন যে মানুষকে নস্টালজিক করে দেয় !! স্কুল জীবনে গোলাপ নিয়ে গল্প নেই এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল , সে ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন !থাক সেকথা , কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করে আনা আমার লক্ষ্য না। আমিও বিবাহিত পুরুষ , আমার হোম মিনিস্টার কে সমঝে চলি। তারপর ধরুন , সেকালের শাহজাহান এর হাতের সেই গোলাপ ।ওটার নাম জানেন ? সে গোলাপ এর একটা ভারী সুন্দর গল্প আছে , সেটা নাহয় অন্য আরেকদিন শোনাবো ।

    যাইহোক পাশের বাড়ির লিপিদির গোলাপ দেখেই হোক বা নার্সারি তে ভার্মি কম্পোস্ট কিনতে গিয়েই হোক , ফুটন্ত গোলাপ দেখেই আপনার কেমন যেন মনটা আনচান করে উঠলো , উঠিয়ে নিয়ে এলেন । প্রথম ৩/৪ মাস বেশ ভালো ভাবেই কাটলো , তারপর শুরু হলো গন্ডগোল । একটা ডাল হুড়হুড়িয়ে বাড়তেই থাকলো আর অন্য ডাল গুলো আর বাড়েই না । মহা মুশকিল !!! ফুলেরও আর দেখা নেই ।

     সমস্যাটা হলো এলা ডাল , জিনিসটা কি বা কেন বুঝলেন না, এদিক ওদিক থেকে আইডিয়া হলো যে সাতপাতার ডাল এ নাকি ফুল হয় না । মনস্থির করলেন যে সব সাতপাতার ডাল কেটে দেবেন । কাঁচি নিয়ে গেলেন , গিয়ে আবার অন্য কনফিউশন !!! অনেকগুলো পাঁচপাতার মধ্যে কতগুলো সাতপাতা উঁকি দিচ্ছে , তাহলে কি ডাল তা কাটবেন নাকি কাটবেন না ? খানিকটা ধাঁধিয়ে দিলেন সাঁইসাঁই কাঁচি চালিয়ে , কার আর ওতো ধৈর্য থাকে বলুন !!!

     আমি বলি কি এই লেখাটা পুরোটা পড়ুন ধৈর্য ধরে , জীবনে আর এই নিয়ে কোনো কনফিউশন থাকবে না এটা গ্যারান্টি দিতে পারি ।

    আগে একটু গোলাপ এর ভি গ্রাফটিং বা জোড় কলম এর ব্যাপারটা জেনে নিন , তাতে বুঝতে সুবিধা হবে । মূলত আপনারা নার্সারি থেকে যে গোলাপ গাছগুলো কেনেন সেগুলো প্রায় সবই জোড়কলম এর গাছ । কিনছেন একটা গাছ , কিন্তু একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখবেন আসলে ওটা দুটো গাছ , একটার সাথে অন্যটা জোড়া লাগানো ।
 গাছটার একদম গোড়ার দিকে খেয়াল করলে দেখবেন একটা গিঁট এর মতো জিনিস দেখতে পাবেন , ঐখানেই আসলে দুটো গাছ একে অপরের সাথে জোড়া লাগানো আছে । 

  কিন্তু হটাৎ এরকম জোড়া লাগাতে গেলো কেন ? 

আসলে গোলাপের এই যে এতো ভ্যারাইটি দেখেন সবগুলো কিন্তু আমাদের এখানকার নেটিভ বা স্থানীয় গাছ না , বেশিরভাগই বাইরের দেশ থেকে নিয়ে আসা। আমাদের এখানকার ওয়েদার এ ওই গাছ ভালো হয় না । ডিরেক্ট চারা লাগালে একে তো বাঁচানো মুশকিল তারপর বাঁচাতে পারলেও রোগ লেগেই থাকবে, ফুল এর সাইজ ছোট হয়ে যাবে। পাতি বাংলায় গাছের মতো গাছ হবে না ।

     তাবলে কি আমরা ভালো গোলাপ করবো না ? উপায় এই জোড়কলম !!! এটার আবিষ্কার নিয়েও একটা খুব সুন্দর গল্প আছে ।

  এতে যেটা করা হয় সেটা হলো একটা বেশ হার্ডি দেখে দেশি গোলাপ গাছ নেওয়া হয় , যেটা আমাদের দেশের আবহাওয়াতে অনেকদিন বেঁচে থাকে , তারপর সেটার সাথে বিদেশী জাতের বা সৌখিন জাতের গোলাপ এর ডাল জুড়ে দেওয়া হয় । সবমিলিয়ে যেটা দাঁড়ায় সেটা হলো দেশি হার্ডি জাতের গাছের শিকড় ( ইংরিজিতে বলে রুটস্টক ) আর ২ ইঞ্চি মতো কান্ড আর তারওপর ওই শৌখিন বিদেশী আলটুসি গাছ । দেশি গোড়া মাটি থেকে পুষ্টি টেনে ওপরের শৌখিন আলটুসি রানীকে বাঁচিয়ে রাখে ।

   কেমিস্ট্রি টা বুঝুন !!! 

 আপনার গোলাপ গাছটাকে ভালো রাখতে গেলে এই কেমিস্ট্রি টাকে বদলাতে দিলে হবে না । নিচের ওই হার্ডি দেশি গাছ যদি একবার শাখা বার করে বাড়তে শুরু করে তাহলে কিন্তু আর ওই শৌখিন আলটুসি গাছ পুষ্টি পাবে না , ফলে বাড়বেও না ,ফুলও দেবে না । আস্তে আস্তে মরে যাবে ।

   দেশি গাছের এই শাখা গুলোকেই বলে গোলাপ গাছের এলা ডাল । দেখলেই কেটে ফেলতে হবে , নাহলেই গাছের সর্বনাশ । কেন সর্বনাশ সেটা এতক্ষনে নিশ্চই বুঝে গেছেন ।

    এবার আপনার মনে প্রশ্ন ,বুঝবেন কি করে কোনটা এলা ডাল আর কোনটা ভালো ডাল ? পয়েন্ট করে বলছি একদম মনে গেঁথে নিন ।

(১) জোড়কলম এর নিচে থেকে বেরানো যেকোনো ডাল ই হলো এলা ডাল। তাই জোড়কলম এর নিচে থেকে যেকোন ডাল কেটে ফেলুন , পাঁচপাতা , সাতপাতা কিচ্ছু দেখবেন না । দেখা মাত্র কেটে ফেলুন ।

(২) অনেকসময় জোড়কলম থেকেও শাখা বেড়ায় ,এক্ষেত্রে এটা এলা ডাল ও হতে পারে , ভালো ডাল ও হতে পারে । এলা ডাল হলে শাখা বেরানোর সময় সবুজ হয়ে বেড়ায় , ভালো ডাল হলে লাল হয়ে বেড়ায় । যদি ডাল অলরেডি অনেক বড়ো হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে দেখুন ওই ডালটা গাছের অন্নান্য ডাল এর থেকে একটু বেশি হৃষ্টপুষ্ট কিনা , অন্য ডাল এর থেকে অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ছে কিনা , অন্য ডাল এর থেকে বেশি কাঁটা আছে কিনা । 
      যদি এই লক্ষণ গুলো দেখেন তাহলে কেটে ফেলুন , ওটা এলা ডাল ।

(৩) যদি জোড়কলম এর ওপর থেকে কোনো শাখা বেড়ায় ওটা রেখে দিন ,সাতপাতা হলেও রেখে দিন, ওটা ভালো ডাল । ওতে ফুল আসবে ।

     শেষে কয়েকটা দরকারি টিপস দিয়ে রাখি 

(১) গাছ কিনে এনেই জোড়কলম টা চিহ্নিত করে তার ১ইঞ্চি ওপরে পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে মার্ক করে রাখুন । ৫ সেকেন্ড এর কাজ , কিন্তু গাছটা যতদিন বাঁচবে ততদিন আর এলা ডাল নিয়ে চিন্তা করতে হবে না । এই মার্ক এর নিচে যেকোনো শাখা বেড়ালেই কেটে ফেলবেন । 

(২) ধরুন একদম শিওর হতে পারছেন না যে এলা ডাল না ভালো ডাল , আমি বলবো কেটে ফেলুন । গোলাপ গাছ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে , চিন্তা নেই আবার গাছ বেড়ে যাবে , কিন্তু বাই চান্স এলা ডাল রেখে দিলে গাছটারই বারোটা বেজে যাবে ।

     এরপরেও সন্দেহ থাকলে গাছপাকা তোহ আছেই । ছবি দিলে বলে দেব রাখবেন না কাটবেন ।

     ভালো থাকুন আর মনের সুখে গোলাপ গাছ করুন ।

আর হ্যাঁ , ওই পাঁচ পাতা সাত পাতার গল্প টা না একদম ফালতু । অসংখ্য গাছ দেখেছি যাতে সাতপাতা কিন্তু ফুল হচ্ছে , আবার অনেক গাছ দেখছি পাঁচপাতা কিন্তু ফুল নেই । তাই পাঁচপাতা সাতপাতা নিয়ে একদম টেনশন নেবেন না ।

Thursday, December 28, 2023

জলবাগানে হতেখড়ি পর্ব - ৩ - অঙ্গন আমার প্রকৃতি

পদ্ম আর ওয়াটার লিলি নিয়ে আগের দুটো পর্বে বেশ খানিকটা ধারণা হয়ে গেছে আপনাদের। অন্তত এইটুকু জেনে গেছেন যে দুটোই খুব সহজে হয়, গাছ বসানোর এক মাসের মধ্যে ফুল চলে আসে আর বাড়ির ছাদে, বারান্দায় সব জায়গাতেই করা সম্ভব। 
       লক্ষ্মী ঠাকুরের হাতে থাকে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন পদ্ম ফুল বাড়িতে থাকা শুভ।হিন্দু ধর্মে পদ্ম আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। ধ্যান এর সময় হৃদপদ্মের ধ্যান করেন অনেকে । দুর্গা পূজা পদ্ম ছাড়া অসম্পূর্ণ।

       যাইহোক ,আগের পর্বে পদ্মের ভ্যারাইটি গুলো নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। ওটা না পড়ে থাকলে একটু দেখে নেবেন।আমার পেজে স্ক্রল করলেই পেয়ে যাবেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বলা আছে ওখানে।

      আজ বলবো পদ্ম গাছ বসাবেন কিভাবে? 

 👉 পট নির্বাচন 

           মাটির পট হলে সবথেকে ভালো , সিমেন্ট এর পটেও খুব ভালো গাছ হয়। সব সাইজের পটে সব ভ্যারাইটি ভালো হয় না। তাই হয় ভ্যারাইটি হিসাবে পট কিনুন বা পট হিসেবে
ভ্যারাইটি নিন। কোন ভ্যারাইটি কি পটে সবথেকে ভালো হয় , এটা যার থেকে রাইজম নেবেন তার থেকে জেনে নেবেন। এক একটা ভ্যারাইটির অনেক সাব ভ্যারাইটি হয় , আগের পর্বে আলোচনা করেছি , আপনারটি কোন সাব ভ্যারাইটি যার গাছ একমাত্র সেই বলতে পারবেন।

      কফি খাবার কাপ থেকে শুরু করে মিষ্টির মালসা , বারো ইঞ্চি ছোটো গামলা ,পঁচিশ লিটারের বালতি , আঠারো ইঞ্চি গামলা , বাইশ ইঞ্চি গামলা , চার ফুটের সুইমিং পুল , চৌবাচ্চা সব জায়গাতেই পদ্ম গাছ করেছি , সব জায়গাতেই এক মাসের মধ্যে ফুল পেয়েছি। তাই দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি , জায়গা হিসাবে ভ্যারাইটি নিলে ফুল পেতে কোনো সমস্যা হবে না।

     মাটির বা সিমেন্ট এর বড়ো পট অনেকটা ভারী হয়ে যায় , রিপট করার সময় অনেক সমস্যা হয় , তাই অনেকেই প্লাস্টিক এর গামলাতে পদ্ম গাছ করতে পছন্দ করেন। প্লাস্টিক এর গামলা অনেক হালকা ও হয়। কিন্তু গাছ সবথেকে ভালো হয় মাটির বা সিমেন্টের জায়গায় কারণ এগুলো রোদ পড়লেও চট করে গরম হয় না।

    প্লাস্টিক এর গামলা তে গাছ করতে চাইলে অবশ্যই নাইলনট এর কালো গামলা গুলো কিনবেন। এগুলোর দাম কম প্লাস রঙিন গামলা গুলোর মতো রোদ পড়লেও নষ্ট হয় না। 
     জলের গাছ শিকড়ে আলো পছন্দ করে না, তাই ট্রান্সপারেন্ট গামলা কিনবেন না, ওতে গাছ ভালো হবে না।

     যেহেতু এগুলো জলের গাছ , তাই নিচে ফুটো করার কোনো দরকার নেই।

    পদ্মের পট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা দুটো সংখ্যা বলি যেমন ধরুন ১৮/১০ , এর মানে আঠারো ইঞ্চি ব্যাস/ ডায়ামিটার আর দশ ইঞ্চি গভীরতা।  ভ্যারাইটি হিসেবে ব্যাস আর গভীরতা দুটোই ম্যাটার করে।

     পদ্ম গাছ কোনা জায়গা পছন্দ করে না। তাই চারচৌকো জায়গায় পদ্ম গাছ বসাবেন না। গাছের বাড়তে সমস্যা , সাথে রিপট করার সময় রইজম এর আকৃতি খুব বাজে হয়। চেষ্টা করবেন যাতে গোলাকার পাত্রে  গাছ বসানো যায়।

    সিমেন্ট এর চৌবাচ্চা তে গাছ করলে কোনাগুলো গোল করে নেবেন, অনেক বেটার গাছ হবে।

👉 মিডিয়া তৈরি 

      বেলে মাটি বাদে যেকোনো মাটিতে পদ্ম গাছ হয়। জলে ভেজা মাটি হাতের মুঠোতে নিয়ে মুঠো খুললে যদি মাটি আলগা হয়ে ঝরে পড়ে জেনে রাখবেন ওই মাটিতে ভালো গাছ হবে না। এঁটেল মাটি বা দোআঁশ মাটি হাতের কাছে যে মাটি পাবেন তাতেই গাছ করুন।
       শুধু নার্সারী থেকে সার দেওয়া মাটি কিনবেন না , ওগুলোতে কি থাকে আর কি থাকে না ভগবান ও জানে না। যারাই এই মাটিতে গাছ করার চেষ্টা করেছেন , কারোই ভালো গাছ হয়নি।

        অনেকের মনেই ভুল ধারণা পুকুরের পাক মাটি ছাড়া পদ্ম গাছ হয় না ।কথাটা ঠিক না । আমার একটা গাছও পাক মাটিতে করা নেই, খুব খারাপ গাছ হয়নি আমার।

       নিঃসন্দেহে পাক মাটিতে পদ্ম গাছ ভালো হয় , তবে সেক্ষেত্রে মাটি তুলে রোদে শুকিয়ে তারপর ব্যবহার করতে পারলে ভালো। অনেকেই দেখেছি পাক মাটিতে রাইজম লাগিয়ে গাছ পচিয়ে ফেলেছে। তাই পাক মাটি ব্যবহার করতে হলে সাবধানে করুন।

       চাষের জমির মাটিতে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার মিশে থাকে । এই মাটিতে অনেক সময় রাইজম পচিয়ে দেয়। সম্ভব হলে এই মাটি এড়িয়ে চলুন।

       যদি কোনো কারণে চাষের জমির মাটি বা পুকুরের পাক মাটি ব্যবহার করতেই হয় তাহলে কোনো অভিজ্ঞ জলবাগানির গাইডেন্স নিয়ে করুন।তাকে রেগুলার আপডেট দিন , সমস্যা দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে একশন নিন। 

   পতিত জমির মাটি, মানে যে জমিয়ে দীর্ঘদিন চাষবাস হয়নি সেরকম জমির মাটি সবথেকে নিরাপদ পদ্ম গাছের জন্য । কাছাকাছি বন জঙ্গল থাকলে সেখানকার মাটিও নিতে পারেন , এই মাটিতে এতো পরিমাণে জৈব পদার্থ মিশে থাকে যে গাছ খুব সুন্দর হয়।

     অনেকেই বলে গামলার একদম নিচে ২০% সার ( গোবর সার বা ভার্মি কম্পোস্ট) , তার ওপর ৫০% মাটি আর একদম ওপরে ৩০% জল এইভাবে মিডিয়া করলে সবথেকে ভালো গাছ হয়। এই অনুপাত অনেক বছর ধরেই চলে আসছে।

     এতে গাছ হয় , কিন্তু এভারেজ গাছ হয় , এভারেজ ফুল হয়। একটাই কারণ , সব ভ্যারাইটির সার এর প্রয়োজন সমান না। কোনো ভ্যারাইটি একটু বেশি খায় , কোনো ভ্যারাইটি একটু কম খায়। 

       খাদ্যের প্রয়োজন বুঝে সার এর পরিমাণ ঠিক করলে একই পটে একই ভ্যারাইটি অনেক বড়ো ফুল দেবে অনেক বেশি ফুল দেবে আর অনেক বেশিদিন ধরে ফুল দেবে।

   অনেকেই পোস্ট করেন , চার পাচটা ফুল দিয়েই গাছ ঘুমিয়ে পড়েছে । এরকম হয় যদি ভ্যারাইটি হিসেবে পট সাইজ খুব ছোটো বা খুব বড়ো হয়ে যায়। সার খুব কম বা সার খুব বেশি হয়ে গেলেও এটা হয়।

২০:৫০:৩০ এই রেশিও তে গাছ করা আর সব পরীক্ষায় চল্লিশ পেয়ে পাস করা একই জিনিস। তবে হ্যা , এই নিজে নিজে গাছ করলে এই রেশিওতেই ১৮/১০ পটে গাছ করুন , মোটামুটি সব ভ্যারাইটি এই পট সাইজে ,এই রেশিও তে ফুল দেবে। ফেল করার থেকে চল্লিশ পেয়ে পাস করাটা ভালো।

   গোবর সার এ খুব ভালো গাছ হয় । নিজের এক্সপেরিইয়েন্স না থাকলে বা অভিজ্ঞ কারো গাইডেন্স এ গাছ না করলে কাঁচা গোবর সার এড়িয়ে চলুন। অন্তত এক বছরের পুরানো শুকনো গোবর সার নিন, এটা অনেক নিরাপদ গাছের জন্য। ভার্মিকম্পোস্ট এও সুন্দর গাছ হয়। 

   এরপর ভ্যারাইটি হিসাবে পরিমাণ মতো হিউমিক এসিড, সি উইড, স্টিমড বোনডাস্ট, অল্প নিমখোল এসব দিতে পারেন। গাছ বসানোর সময় রাসায়নিক সার না দেওয়াই ভালো বা দিলেও খুব বুঝেশুনে।
      আমার থেকে যারা রাইজম নেন, আমি ভ্যারাইটি হিসাবে  কোনটা কি পরিমাণে দেবেন গাইড করে দিই।

     গাছ বড়ো হলে যেকোনো ব্যালান্সড NPK যেমন ২০:২০:২০ বা ১৯:১৯:১৯ , আর প্রয়োজন বুঝে DAP, লাল পটাশ , এপসম সল্ট দিতে পারেন। ইউরিয়া ব্যবহার না করাই ভালো। 
     একটা কথা জানিয়ে রাখি শুধু পুরানো গোবর সার বা ভার্মি দিয়েও সুন্দর গাছ হয়। তাই এগুলো হাতের কাছে না না থাকলে আতঙ্কিত হবেন না। যেকোনো রাসায়নিক সার প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে গেলে মাটি নষ্ট করে দেবে , গাছ নষ্ট করে দেবে। তাই ব্যবহার করতে হলে ভালোভাবে জেনে বুঝে তারপর করবেন।

     গাছের পাতা দেখে , গাছের বয়স হিসেবে গাছের গ্রোথ দেখে বোঝা যায় গাছের এই মুহূর্তে কি ধরনের খাবারের প্রয়োজন। এই জিনিসটা লিখে বোঝানো যায় না, এই সেন্স টা একদিনে আসবে না। একই ধরনের গাছ বছরের পর বছর করতে থাকলে ধীরে ধীরে আপনিও বুঝতে পারবেন।

     যতোদিন না সেই সেন্স টা আসে , যেকোনো রাসায়নিক সার গাছে দেওয়ার আগে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিয়ে করুন। আমাদের শুধু জলের গাছের একটা গ্রুপ আছে,ওখানেও ছবি পোস্ট করে পরামর্শ চাইতে পারেন।

    ভ্যারাইটি হিসাবে সঠিক সাইজের পট নিয়ে ঠিকঠাক মিডিয়া বানিয়ে একবার গাছ বসিয়ে দিতে পারলে সারা বছর আর কোনো টেনশন থাকে না। সপ্তাহে এক দুবার জল দিলেই গাছ বিন্দাস থাকবে আর ফুল দিয়ে যাবে।

   পরের পর্বে রাইজম কিভাবে বসাবেন সেটা নিয়ে আলোচনা করবো।

Monday, December 25, 2023

জলবাগানে হাতেখড়ি পর্ব - ২ - অঙ্গন আমার প্রকৃতি

আজকের পর্ব পদ্ম/শালুকের ভ্যারাইটি নিয়ে। এই জ্ঞানটা না থাকলে গাছ বসিয়েও ফুল নাও পেতে পারেন , সব ভ্যারাইটি সব জায়গায় , সব মিডিয়াতে ভালো ফুল দেয় না।

একটা এক্সাম্পল দিলে বোধহয় বুঝতে সুবিধা হবে। লিয়াং লি বলে পদ্মের একটা ভ্যারাইটি হয় , এটা মাইক্রো ভ্যারাইটি। এই লিয়াং লির রাইজম নিয়ে যদি একটা বাইশ ইঞ্চির গামলাতে বসান , দেখবেন গাছ যেনো বাড়ছেই না। মাসের পর মাস গাছ প্রায় একই রকম আছে। এটাকে একটা আট ইঞ্চি বা দশ ইঞ্চি জায়গায় বসান , কুড়ি দিনের মধ্যে ফুল চলে আসবে ।

   আশা করি বোঝাতে পারলাম যে গাছের ভ্যারাইটি চেনাটা জরুরী।

    প্রথমে আসি পদ্মের ভ্যারাইটি নিয়ে । কয়েক হাজার বা তারও বেশি ভ্যারাইটি আছে পদ্মের । লাল , পিঙ্ক , সাদা , বাই কালার , বাসন্তী অনেক রকমের রং হয় ।
     এই সবগুলোকে মোটামুটি দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। ট্রপিক্যাল পদ্ম আর হার্ডি পদ্ম। "মোটামুটি" এই শব্দটা কেনো বললাম একটু বাদে বলছি। ট্রপিক্যাল পদ্ম  সেইগুলো যাঁদের ন্যাচারাল হ্যাবিটাট নিরক্ষরেখার আশেপাশে। হার্ডি পদ্ম সেগুলো যেগুলোর ন্যাচারাল হ্যাবিটাট নিরক্ষরেখা থেকে অনেকটা দূরে।

    এই দু এর মধ্যে পার্থক্য কি? রাইজমের গঠনে। হার্ডি পদ্মের রাইজোম অপেক্ষাকৃত মোটা হয় আর বেশি খাবার সঞ্চয় করার ব্যবস্থা থাকে। একটা নোড থেকে অন্য নোড এর দূরত্ব কম থাকে । এগুলোর ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা বেশি। পাতা অপেক্ষাকৃত গোলাকার আর মোটা টাইপের হয়। জিনগত পার্থক্য আছে। ব্যতিক্রম থাকলেও সার্বিক ভাবে ট্রপিক্যাল পদ্ম ,হার্ডি পদ্মের থেকে ফুল বেশি দেয়, আর অনেক দেরি পর্যন্ত ফুল দেয়।

     এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি হাইব্রিড পদ্ম যেগুলো আমরা করি আমাদের ছাদ বাগানে বা ফ্ল্যাট বারান্দায়, সেগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ হার্ডি আর ট্রপিক্যাল এর সংকরায়ণ এর ফলে তৈরি ভ্যারাইটি। পিওর ট্রপিক্যাল বা পিওর হার্ডি ভ্যারাইটি খুব কম । পিওর ভ্যারাইটি জিন টেস্ট ছাড়া ধরা যায় না, এই টেস্ট এক্সপেন্সিভ বলে কেউ করায় ও না।
       পিওর ভ্যারাইটি কিন্তু অমূল্য। বিশেষ করে যাঁরা হাইব্রিড বানান তাদের জন্য। একটা পিওর ভ্যারাইটি পাওয়ার জন্য এরা আপনাকে একশোটা ভ্যারাইটি দিয়ে দিতে পারে । 

     যাইহোক, যেটা বলছিলাম .. অধিকাংশ ভ্যারাইটিই হার্ডি আর ট্রপিক্যাল এর সংকরায়ণ এর ফলে তৈরি ভ্যারাইটি। তাই এদের মধ্যে লক্ষণ মিক্স হয়ে থাকে।

   আমি বলি কি , কি যায় আসে কোনো ভ্যারাইটি ট্রপিক্যাল নাকি হার্ডি ... গাছ ফুল কেমন দেয়, তাড়াতাড়ি ফুল দেয় কিনা আর সিজনের শেষ দিন পর্যন্ত ফুল দেয় কিনা সেটা দেখে কিনুন।  কথা যখন ফুল নিয়ে , তখন ফুল দেখেই কিনুন ।
      হার্ডি, ট্রপিক্যাল এর ব্যাপারটা জানালাম এই কারণে অনেক সেলার এই সব টার্ম ইউস করে আপনাকে কনভিন্স করার জন্য । জানা থাকলে ইনফর্মড ডিসিশনটা নিতে পারবেন।

      তবে একটা জিনিস , হার্ডি মানেই কম ফুল দেয় এরকম কিন্তু না। অনেক হার্ডি আছে যেগুলো খুব খুব ভালো ব্লুমার। আবার অনেকে কিছু কিছু হার্ডি ভ্যারাইটি থেকে সিজনে তিনটে ফুল পায় কিনা সন্দেহ।

    আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি ভ্যারাইটি হিসাবে গামলার সাইজ আর সার মাটির অনুপাত ঠিকঠাক নিলে হার্ডি বা ট্রপিক্যাল ভ্যারাইটি যাই হোক না সব ভ্যারাইটিই ভালো ফুল দেয়। কোন ভ্যারাইটির জন্য কি সাইজের গামলা নেবেন আর কিভাবে মিডিয়া তৈরি করবেন আপনার সেলারের থেকে জেনে নিন। আমি আমার কাস্টমার দের গাইড করে দি , মোটামুটি সবাই ভালো ফুল পায়।

     ভ্যারাইটি হিসাবে গামলার সাইজ কি নেবেন আর কীভাবে মিডিয়া বানাবেন এটার লিস্ট চাইবেন না। দিতে ইচ্ছুক নই এমন না , দেওয়া সম্ভব না। কারণটা এবার বলছি।

     একটা ভ্যারাইটির ফুল থেকে রেনু নিয়ে অন্য ভ্যারাইটির ফুলের সাথে কৃত্রিম পড়াগমিলন করে যে বীজ তৈরি হয় ওটা থেকে গাছ বড়ো করলে হতে পারে একটা নতুন ভ্যারাইটি পেয়ে গেলেন। এটার পদ্ধতি এতটাই সোজা যে হাতে কলমে দেখাতে ঠিক গুনে গুনে পাঁচটা মিনিট লাগবে একটা ক্লাস সেভেন এর বাচ্চাকে একবার দেখিয়ে দিলে সেও করে ফেলবে । আর পদ্মের বীজ খুব সহজেই হয়।

     হাইব্রিড তৈরির প্রধান চ্যালেঞ্জ মাদার আর ফাদার হিসাবে কোন দুটো ভ্যারাইটি নেবেন সেটা ঠিক করা, সব ভ্যারাইটি ভালো মাদার হয় না, সব ভ্যারাইটি ভালো ফাদার হয় না । যেহেতু অধিকাংশ ভ্যারাইটি পিওর না , তাই কোন বীজে কোন ঘুমিয়ে থাকা জিন সক্রিয় হয়ে উঠবে এটা আগে থেকে জানা যায় না। একই সিডপড এর তিনটে বীজ থেকে করা গাছের ফুল তিনরকম হতে পারে আবার অবিকল মা গাছের মতো হতে পারে.... ফুল না হওয়া পর্যন্ত জানতে পারবেন না যে কীরকম ফুল হবে।

    এই কারণেই বীজের গাছে কোনো গ্যারান্টি নেই যে গাছ বড়ো হলে ফুল কেমন হবে। কন্দ বা রাইজম থেকে গাছ করলে একদম নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে মা গাছের মতোই ফুল দেবে। তাই প্রথম বার গাছ করলে অবশ্যই কন্দ বা রাইজম থেকে গাছ করুন , বীজ থেকে না।

    এইবার ধরুন , একজন কেউ পদ্মের হাইব্রিড বানানোর চেষ্টা করলো , যেটা অনেকেই করে যেহেতু পদ্ধতি টা খুব সোজা।  গাছে এই পদ্ধতিতে বীজ হলো , বীজ থেকে গাছ হলো , কিন্তু ফুল যখন ফুটলো সেটা মা গাছের থেকে খুব সামান্য আলাদা । এতটাই সামান্য পার্থক্য যে খুব ভালো করে লক্ষ্য না করলে বোঝা যায় না। 

     এখন এটাকে নতুন ভ্যারাইটি বলে বাজারে ক্লেম করা যাবে না , কিন্তু অনেকেই যেটা করে এই গাছের টিউবার অরিজিনাল মা গাছের টিউবার বলে চালিয়ে দেয়। এখন এই টিউবার থেকে গাছ করলে সেটা মা ভ্যারাইটির মত দেখতে ফুল দিলেও অন্য প্রপার্টি গুলো যেমন ফুলের সংখ্যা , সেনসিটিভিটি, লেট ব্লুমিং ক্যাপাসিটি অনেক কিছুই মা গাছের থেকে আলাদা হয়ে যায় ।

      হাইব্রিড তৈরির পদ্ধতিতে অনেক সময় জেনেটিক ডিফর্মমিটি চলে আসে। কারো কারো গ্রীন অ্যাপল ভীষণ সেনসিটিভ , একটুতেই মরে যায়। আবার কারো কাছে খুব সহজেই হয় , প্রচুর ফুল দেয় আর অনেক দিন পর্যন্ত ফুল দেয়। কারো গ্রিন অ্যাপল টিউবার দিতেই চায় না , আবার কারো কাছে মোটা মোটা টিউবার দেয়।

     মনে হয় বোঝাতে পারলাম ভ্যারাইটি হিসাবে গামলার সাইজ কি নেবেন আর কীভাবে মিডিয়া বানাবেন এটা আমি বলতে পারবো একমাত্র সেই রাইজম গুলোর ক্ষেত্রে যেগুলোর মাদার গাছ আমার নিজের বাগানে আছে। আপনার সেলারের কাছে কোনো ভ্যারাইটির কোন সাব ভেরিয়েন্ট আছে , সেটা আমার পক্ষে বোঝা কোনোমতেই সম্ভব না। আর আজকাল সবাই সেলার ।

    তাহলে বুঝবেন কি করে যে আপনার কাছে সবথেকে ভালো ভ্যারাইটি টা আছে? নামিদামি পাঁচজন সেলার এর থেকে পাঁচটা একই ভ্যারাইটির রাইজম কিনুন , গাছ করে দেখুন কোনটা সবথেকে ভালো , তারপর ভালোটা রেখে দিন।
      এটাই একমাত্র উপায় , কিন্তু সবার পক্ষে এই মেথড ফলো করা সম্ভব না , কারণ অনেকটা সময় নষ্ট , টাকা নষ্ট।

   আমি এই পদ্ধতিতেই ভালো গাছ কালেক্ট করি , কারণ এটাই আমার ভালোলাগার জায়গা আর রাইজোম সেল করে আমার গাছ করার খরচ উঠে আসে। পাঁচটা গাছের মধ্যে চারটে ফেলে দিলেও আমার গায়ে লাগে না।

     কি সাইজের গামলায় বসালে সবথেকে ভালো ফুল দেবে সেই হিসাবে দেখতে গেলে পদ্মের ভ্যারাইটিগুলো মোটামুটি তিনটে ভাগ করা যায়। মাইক্রো, বোল , মিডিয়াম আর লার্জ। মাইক্রো মানে যেগুলো ধরুন ৬-৮ ইঞ্চি গামলায় ভালো ফুল দেয় , বোল মানে যেগুলো ধরুন ১০-১৬ ইঞ্চি গামলায় ভালো ফুল দেয় , মিডিয়াম মানে যেগুলো ধরুন ১৮-২২ ইঞ্চি গামলায় ভালো ফুল দেয়, আর লার্জ মানে ২২ ইঞ্চির থেকে বড়ো জায়গা লাগে।
      এখন এই ভাগটার কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই। মানে কেউ যেটাকে বোল বলে অন্য আরেকজন সেটাকে হয়তো মিডিয়াম বলে । তবে মোটামুটি একটা আইডিয়া দেওয়ার জন্য রেঞ্জ গুলো বললাম।

     মাইক্রো ভ্যারাইটি যদি ২২ ইঞ্চি পটে বসান , ফুল দেবে না , বা অনেক অনেক দেরি হবে ফুল আসতে। লার্জ ভ্যারাইটি ৬-৮ ইঞ্চি পটে বসালে ফুল নাও পেতে পারেন।

এরপর কিছু আছে মনসুন ব্লুমার , মানে বৃষ্টির জল না পেলে ওনারা ফুল দেবে না। এরকম ভ্যারাইটি মার্চে বসালে জুলাই পর্যন্ত শুধু পাতা দেখে কাটাতে হবে ।

     আপনাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়তো বলে ফেললাম। তবে যেহেতু জলের গাছ নিয়ে বই লিখছি তাই যা জানি সব এক একটা পোস্টে এক জায়গায় করছি।

    এসব পড়ে ঘাবড়াবেন না। পদ্মের মতো সহজে হয় আর বিনা ঝঞ্ঝাট এর গাছ আমি দেখিনি। ঠিক সাইজের পটে ঠিক ভাবে মিডিয়া তৈরি করে বসিয়ে দিলে ৪৫ দিনের মধ্যে ফুল চলে আসবে । কিন্তু কোনটা ঠিক সাইজের পট , আর ঠিক মিডিয়া কি সেটাই একটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। যার গাছের কন্দ একমাত্র সেই বলতে পারবে।

    অনেকেই অন্য সেলার এর থেকে গাছ নিয়ে ফুল না পেয়ে আমাকে মেসেজ করেন , বাধ্য হয়ে "জানি না" বলতে হয়। অনেকেই অহংকারী মনে করেন , অনেকেই ভাবেন আমার থেকে গাছ নেননি বলে হয়তো গাইড করছি না। কিন্তু ঘটনা হলে কারো পক্ষেই অন্য কারো কন্দ থেকে গাছ এর ব্যাপারে কিছু বলা সম্ভব না। যাঁরা বলে তারা এই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় গুলো জানেন না ।

    এক্সচেঞ্জ এর গ্রুপগুলো থেকে বা কোনো গ্রুপ ইভেন্ট থেকে পাওয়া কন্দ থেকে গাছ করে ফুল না পেলেও অনেকে হেল্প নিতে মেসেজ করেন । এনাদের ভ্যারাইটির নাম জিজ্ঞেস করলে বলেন "গিফট পাওয়া"। মিনিমাম ভ্যারাইটির নাম না জানলে কি গাইড করবো বলুন? 

     ফেসবুকে অনেক রকম মানুষ আছেন। একজন গাইডেন্স চেয়ে মেসেজ করার পর আমি "জানি না" বলাতে মেসেজই গালাগালি শুরু করে দিয়েছিলেন ... "অহংকারী" , "বলুন , কতো টাকা নেবেন হেল্প করতে " , "এই জ্ঞান নিয়েই স্বর্গে যাবেন, কারো কোনো কাজে লাগবে না" এইসব ! 

লোকের ভালো করতে যাওয়ারও সমস্যা আছে অনেক। আমার জানা না থাকলে "জানি না" বলার শিক্ষাই ছেলেবেলা থেকে পেয়েছি... আটত্রিশ বছর বয়সে দুম করে অভ্যাস বদলে ফেলতে পারবো না।  ভুলভাল বলে দিতে সাহস লাগে না , "জানি না" বলতে কিন্তু যথেষ্ট সাহস লাগে।

পরের পর্বে ওয়াটার লিলির ভ্যারাইটি গুলো নিয়ে লিখবো।সম্ভব হলে পোস্টটা শেয়ার করবেন, কিছু মানুষের উপকার হবে, তবে আসল কথাটা হলো এটা করতে আপনার একটা সেকেন্ড লাগবে কিন্তু আমার অনেকটা উপকার হবে।

© গাছপাকা

জলবাগানে হাতেখড়ি পর্ব - ১ - অঙ্গন আমার প্রকৃতি


জলবাগান মানে জলজ গাছ যেমন পদ্ম, ওয়াটার লিলির মতো গাছ নিয়ে ফুলের বাগান। প্রথম পর্বে সার সংক্ষেপ। পরের পর্ব গুলোতে ডিটেলস।

    এই পর্বের উদ্দেশ্য যাতে আপনি খুব তাড়াতাড়ি একদম বেসিকটা শিখে ফেলতে পারেন আর একদম নতুন হলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে এই গাছগুলো আপনার জন্য সঠিক কিনা।

১) পদ্ম ,ওয়াটার লিলিকে আমরা জলের গাছ বললেও মিডিয়া ( মাটি, সার) দরকার। যদি রাইজম এর মধ্যে অনেক খাদ্য সঞ্চিত থাকে তাহলে শুধু জলে একটা দুটো ফুল পেলেও পেতেও পারেন , কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী ভালো গাছ এর জন্য মাটি, সার দুটোই দরকার।

২) পদ্ম বা ওয়াটার লিলির ভালো গাছ হওয়ার জন্য, ফুল হওয়ার জন্য দিনের মধ্যে যেকোনো সময় কমপক্ষে ৩/৪ ঘণ্টা সরাসরি সূর্যালোক বা সারাদিন উজ্জ্বল আলো ,এর যেকোনো একটা প্রয়োজন। ছায়া জায়গায় গাছ হবে , কিন্তু কিছু স্পেসিফিক ভ্যারাইটি ছাড়া ফুলের দেখা পাবেন না।
বাড়ির ছাদে সব ভ্যারাইটি করতে পারবেন , ফ্ল্যাট বারান্দায় করলে সিলেক্টিভ ভ্যারাইটি করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৩) ইনডোরেও এই গাছ করতে পারেন , তবে তার জন্য দিনে আঠারো ঘণ্টা ফুল স্পেকট্রাম গ্রো লাইট, ওয়াটার হিটার , স্পেসিফিক ভ্যারাইটি আর কঠোর পরিশ্রম লাগবে। এক্সপেরিমেন্টালি করতে চাইলে ওয়েলকাম, নতুনদের জন্য স্ট্রিকটলি "না"।

       খোলা আকাশের তলায় , সারাদিন আলো বাতাস পেলে এই গাছ সবথেকে সহজে হয়।

৪) পদ্ম ,ওয়াটার লিলি অত্যন্ত হার্ডি গাছ । কিছু বেসিক জিনিস জেনে নিলে এই গাছ অমর। যেকেউ এই গাছ করতে পারবেন , এমনকি কেউ জীবনে অন্য কোনো গাছ না করলেও এই গাছ করতে পারবেন। জবা বা গোলাপ এর তুলনায় হাজার গুনে সহজ এই গাছ করা। তাই করতে পারবেন কি পারবেন না এটা ভাববেন না।

৫) ভেজা মাটিতেও ( জমা জল ছাড়া ) এই গাছ হবে আর ফুলও দেবে। তবে প্রতিদিন জল দিতে হবে যাতে মাটি শুকিয়ে না যায়। 
      দু/তিন ইঞ্চি জল সবসময় ধরে রাখলে সপ্তাহে একবার জল দিলেই যথেষ্ট। জলে ৩/৪ টে দেশি guppy মাছ ছেড়ে দিলে সারা বছর মশার লার্ভা একটাও দেখতে পাবেন না।  

৬) বাড়ি তালা দিয়ে দিন দশেক কোথাও ঘুরে আসতে পারেন। ভালো করে জল দিয়ে গেলে গাছের কোনো সমস্যা হবে না। তাই বেড়াতে গেলে গাছের কি হবে এই টেনশন থেকে মুক্তি, এটলিস্ট এই গাছের জন্য।

৭) ভালো করে বসিয়ে দিলে , এই গাছের প্রতিদিন পরিচর্যার দরকার পড়ে না। জল কমে গেলে জল দিলেই এই গাছ সুন্দর থাকে। আপনি ব্যস্ত মানুষ হলে এই গাছ আপনার জন্য।

৮) এই গাছে পোকামাকড় খুব কম লাগে। স্পেসিফিক সিজনে জাবপোকা(aphids) হয় , একদিন তামাক পাতা ভেজানো জল দিলেই আবার পরিষ্কার হয়ে যায়।  
       অনেকের গাছে মিলিবাগ , লাল মাকড় হতে দেখি , তবে আলেকালে । আমার গাছে কোনোদিন এগুলো দেখিনি। এগুলো হলেও Actara একদিন স্প্রে করলেই চলে যাবে। এই গাছে সাবান বা শম্পু গোলা জল কখনো স্প্রে করবেন না।

৯) বীজ থেকে গাছ করলেও গাছ হবে আর ফুল ও দেবে। কিন্তু কবে দেবে কোনো গ্যারান্টি নেই। চার মাসেও ফুল পেতে পারেন , আবার চার বছরেও ফুল নাও পেতে পারেন। কি ভ্যারাইটির বীজ, আর কতো বড়ো জায়গায় বসিয়েছেন তার ওপর নির্ভর করবে কতদিনে ফুল আসবে বা আদৌ আসবে কিনা। বিজের গাছের ফুল , মা গাছের ফুলের থেকে একটু হলেও আলাদা হবে।

       রাইজম বা কন্দ থেকে গাছ করলে ৪৫ দিনের মধ্যে গাছ হয়ে ফুল চলে আসবে। নতুনরা রাইজম বা কন্দ থেকেই প্রথমবার গাছ করুন , তাড়াতাড়ি ফুল পেলে উৎসাহ টা থাকবে। যাঁরা অলরেডি একবার হলেও ফুল পেয়ে গেছেন , তারা চাইলে এক্সপেরিমেন্টালি বীজ থেকে গাছ করতে পারেন।

     দশকরমার দোকান থেকে কেনা বীজ সাধারনত ইন্ডিয়ান নেটিভ পিঙ্ক/হোয়াইট পদ্মের বীজ হয়। এগুলো ছোটো জায়গায় খুব কম ফুল দেয়। প্রথমবার করলে দশকরমার দোকান থেকে বীজ না কেনাই ভালো।

১০) নীল পদ্ম হয় না, তাই ফ্লিপকার্ট বা আমাজন এ নীল পদ্মের বীজের আইটেম দেখে কিনে এনে নীল পদ্ম পাবেন এরকম আশা না রাখাই ভালো। বীজ এর গাছে কি ফুল ফুটবে আর কবে ফুটবে এটার গ্যারান্টি ভগবান ও আপনাকে দিতে পারবেন না।

১১) আমাদের দেশের আবহাওয়াতে রাইজোম কেনার আর গাছ বসানোর আদর্শ সময় মার্চ থেকে আগস্ট । সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই সময় রাইজোম কিনতে পারেন , গাছ বড়ো করতে পারেন , তবে গাছ ফুল দেবে মার্চ থেকে আগস্ট। কিছু ভ্যারাইটি অক্টোবর এও ফুল দেয়, তবে সব ভ্যারাইটি দেয় না 

     সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই সময় রাইজোম কিনলে সেলার এর গাইডেন্স নিয়ে গাছ করুন। 

১২) পদ্মের রাইজোম বা কন্দ তুললে দু সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে স্প্রাউট করে যায়, এর পর না বসালে ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে । তখন সেটাকে বিক্রি করার মতো অবস্থায় থাকে না । 
     এই কারণের জন্য নার্সারী গুলো কমার্শিয়াল ভাবে পদ্মের রাইজোম বা কন্দ প্রোডাকশন করতে আগ্রহী না। এতো কম সময়ের মধ্যে বিক্রি করার মতো নেটওয়ার্ক সবার থাকে না, তাছাড়া মোটামুটি সবাই একই সময় কন্দ তোলে ।

    এই কারণে দেখবেন নার্সারী গুলোতে অন্য গাছ খুব সহজলভ্য হলেও পদ্ম বা ওয়াটার লিলি খুব কম পাওয়া যায়। যে একটা দুটো নার্সারী তে পাওয়া যায়, ভ্যারাইটি খুব কম ।

     পদ্মের রাইজোম বা কন্দ কেনার সবথেকে ভালো রাস্তা যাঁরা এই গাছ করেন তাদের অনেকেই কন্দ তুললে সেল করেন। এনাদের থেকে নিতে পারেন। বিশ্বাস করেন এরকম কারো থেকে কন্দ নিন, প্রথম কদিন গাইড করবেন কিনা জেনে নেবেন। প্রথম গাছ করলে প্রথম কদিন কারো গাইডেন্স নিয়ে গাছ করলে ভালো হয়।

১৩) পদ্মের ভ্যারাইটি গুলো মোটামুটি দু ভাগে ভাগ করা যায়। ট্রপিক্যাল আর হার্ডি। অধিকাংশই ভ্যারাইটি হার্ডি আর ট্রপিক্যাল এর সংকরায়ণ এর ফলে তৈরি , তাই পিওর ট্রপিক্যাল বা পিওর হার্ডি জিন টেস্ট ছাড়া বোঝা সত্যি মুস্কিল।

       তাই হার্ডি বা ট্রপিক্যাল এর মধ্যে না গিয়ে , কোন ভ্যারাইটি ভালো ফুল দেয় আর তাড়াতাড়ি ফুল দেয় এটা দেখে কিনুন। কিছু ভ্যারাইটি জুলাই এ বৃষ্টির জল না পেলে ফুল দেয় না , এগুলো মার্চে কিনলে পাঁচ মাস পাতা দেখে কাটাতে হবে। তাই কেনার সময় ভ্যারাইটি দেখে কিনুন।

১৪) শুধু গোবর সার আর মাটিতেও সুন্দর গাছ হয় আর ফুল ও দেয়। গোবর সার টা এক বছরের পুরানো হলে ভালো আর মাটি টা এঁটেল মাটি হলে ভালো। গোবর সার না পেলে ভালো ভার্মিকম্পোস্ট ও নিতে পারেন ।
        গাছের গ্রোথ হিসাবে ব্যালান্সড npk, DAP, লাল পটাশ , হিউমিক অ্যাসিড , সিউইড, মাইক্রো নিউত্রিএন্ট এসব দিতে পারেন , তবে এসব ছাড়াও খুব সুন্দর গাছ হয়।
আমি বসানোর সময় পরিমাণ মতো সব দিয়ে বসিয়ে দি, সারা বছর মাটিতে আর কিছু দিই না ।

    কাঁচা গোবর আর দোআঁশ মাটিতেও দুর্দান্ত গাছ হয় আর ফুলও হয়, তবে এতে রিস্ক অনেক বেশি। সব ভ্যারাইটি এই মিডিয়া নিতে পারে না। কাঁচা গোবর অনেক স্ট্রং বলে একটু বেশি হয়ে গেলেই কন্দ পচে যাবে, গাছের পাতা পুড়ে যাবে। তাই আপনি অভিজ্ঞ না হলে এই মিডিয়া তে যাবেন না । এই মিডিয়াতে গাছ দাড়িয়ে গেলে যেকোনো মিডিয়ায় গাছকে বলে বলে দশ গোল দেবে ।

 ১৫) বেলে মাটি ছাড়া যেকোনো মাটিতে এই গাছ খুব ভালো হয়। আপনার মাটি এই গাছের জন্য উপযুক্ত কিনা জানার সহজ উপায় হলো আপনার মাটি জলে ভালো করে ভিজিয়ে হাতের মুঠো করে ছেড়ে দিলেও যদি ডেলা না ভাঙ্গে , সেই মাটি ঠিক আছে ।

     সারসংক্ষেপ: সবমিলিয়ে পদ্ম, ওয়াটার লিলি খুব সহজে হয়, যেকেউ করতে পারবেন , বাড়ির ছাদে বা বারান্দাতেও হবে, বেড়াতে গেলেও ঝামেলা করবে না, প্রতিদিন পরিচর্যা করতে হবে না আর খুব কম সময়ের মধ্যে ফুল পেয়ে যাবেন । 
      মোটামুটি একটা বেসিক ধারণা বোধহয় আপনাদের দিতে পেরেছি । পরের পর্ব গুলোতে এক একটা দিক ডিটেলস এ আলোচনা করবো ।যেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো একটা লিস্ট দিলাম, কিছু স্কিপ করে গেলে কমেন্টে জানাবেন।

১. পদ্ম/ওয়াটার লিলির ভ্যারাইটি ।
২. মিডিয়া প্রস্তুতি।
৩. কন্দ কিভাবে বসাবেন।
৪. পরিচর্যা কিভাবে করবেন ।
৫. রোগবালাই ও তার প্রতিকার ।
৬. রিপট কিভাবে করবেন।
৭. শীতকালীন পরিচর্যা।

   স্ট্রেস মাল্টিপ্লিকেশন,লং ডিউরেশন প্রিসারর্ভেশন, হাইব্রিড তৈরি এগুলো আপাতত লিস্ট এর বাইরে। এগুলো অ্যাডভান্সড টপিক , হাতেখড়িতে এগুলো নেই ।

কোনো প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় কমেন্টে জানাতে পারেন। জানা থাকলে উত্তর দিতে চেষ্টা করবো ।

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ ছবিতে দেখা যাচ্ছে পেয়ারার ফলের ভেতরের অংশ কালো হয়ে পচে গেছে এবং...