Monday, December 25, 2023

জলবাগানে হাতেখড়ি পর্ব - ২ - অঙ্গন আমার প্রকৃতি

আজকের পর্ব পদ্ম/শালুকের ভ্যারাইটি নিয়ে। এই জ্ঞানটা না থাকলে গাছ বসিয়েও ফুল নাও পেতে পারেন , সব ভ্যারাইটি সব জায়গায় , সব মিডিয়াতে ভালো ফুল দেয় না।

একটা এক্সাম্পল দিলে বোধহয় বুঝতে সুবিধা হবে। লিয়াং লি বলে পদ্মের একটা ভ্যারাইটি হয় , এটা মাইক্রো ভ্যারাইটি। এই লিয়াং লির রাইজম নিয়ে যদি একটা বাইশ ইঞ্চির গামলাতে বসান , দেখবেন গাছ যেনো বাড়ছেই না। মাসের পর মাস গাছ প্রায় একই রকম আছে। এটাকে একটা আট ইঞ্চি বা দশ ইঞ্চি জায়গায় বসান , কুড়ি দিনের মধ্যে ফুল চলে আসবে ।

   আশা করি বোঝাতে পারলাম যে গাছের ভ্যারাইটি চেনাটা জরুরী।

    প্রথমে আসি পদ্মের ভ্যারাইটি নিয়ে । কয়েক হাজার বা তারও বেশি ভ্যারাইটি আছে পদ্মের । লাল , পিঙ্ক , সাদা , বাই কালার , বাসন্তী অনেক রকমের রং হয় ।
     এই সবগুলোকে মোটামুটি দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। ট্রপিক্যাল পদ্ম আর হার্ডি পদ্ম। "মোটামুটি" এই শব্দটা কেনো বললাম একটু বাদে বলছি। ট্রপিক্যাল পদ্ম  সেইগুলো যাঁদের ন্যাচারাল হ্যাবিটাট নিরক্ষরেখার আশেপাশে। হার্ডি পদ্ম সেগুলো যেগুলোর ন্যাচারাল হ্যাবিটাট নিরক্ষরেখা থেকে অনেকটা দূরে।

    এই দু এর মধ্যে পার্থক্য কি? রাইজমের গঠনে। হার্ডি পদ্মের রাইজোম অপেক্ষাকৃত মোটা হয় আর বেশি খাবার সঞ্চয় করার ব্যবস্থা থাকে। একটা নোড থেকে অন্য নোড এর দূরত্ব কম থাকে । এগুলোর ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা বেশি। পাতা অপেক্ষাকৃত গোলাকার আর মোটা টাইপের হয়। জিনগত পার্থক্য আছে। ব্যতিক্রম থাকলেও সার্বিক ভাবে ট্রপিক্যাল পদ্ম ,হার্ডি পদ্মের থেকে ফুল বেশি দেয়, আর অনেক দেরি পর্যন্ত ফুল দেয়।

     এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি হাইব্রিড পদ্ম যেগুলো আমরা করি আমাদের ছাদ বাগানে বা ফ্ল্যাট বারান্দায়, সেগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ হার্ডি আর ট্রপিক্যাল এর সংকরায়ণ এর ফলে তৈরি ভ্যারাইটি। পিওর ট্রপিক্যাল বা পিওর হার্ডি ভ্যারাইটি খুব কম । পিওর ভ্যারাইটি জিন টেস্ট ছাড়া ধরা যায় না, এই টেস্ট এক্সপেন্সিভ বলে কেউ করায় ও না।
       পিওর ভ্যারাইটি কিন্তু অমূল্য। বিশেষ করে যাঁরা হাইব্রিড বানান তাদের জন্য। একটা পিওর ভ্যারাইটি পাওয়ার জন্য এরা আপনাকে একশোটা ভ্যারাইটি দিয়ে দিতে পারে । 

     যাইহোক, যেটা বলছিলাম .. অধিকাংশ ভ্যারাইটিই হার্ডি আর ট্রপিক্যাল এর সংকরায়ণ এর ফলে তৈরি ভ্যারাইটি। তাই এদের মধ্যে লক্ষণ মিক্স হয়ে থাকে।

   আমি বলি কি , কি যায় আসে কোনো ভ্যারাইটি ট্রপিক্যাল নাকি হার্ডি ... গাছ ফুল কেমন দেয়, তাড়াতাড়ি ফুল দেয় কিনা আর সিজনের শেষ দিন পর্যন্ত ফুল দেয় কিনা সেটা দেখে কিনুন।  কথা যখন ফুল নিয়ে , তখন ফুল দেখেই কিনুন ।
      হার্ডি, ট্রপিক্যাল এর ব্যাপারটা জানালাম এই কারণে অনেক সেলার এই সব টার্ম ইউস করে আপনাকে কনভিন্স করার জন্য । জানা থাকলে ইনফর্মড ডিসিশনটা নিতে পারবেন।

      তবে একটা জিনিস , হার্ডি মানেই কম ফুল দেয় এরকম কিন্তু না। অনেক হার্ডি আছে যেগুলো খুব খুব ভালো ব্লুমার। আবার অনেকে কিছু কিছু হার্ডি ভ্যারাইটি থেকে সিজনে তিনটে ফুল পায় কিনা সন্দেহ।

    আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি ভ্যারাইটি হিসাবে গামলার সাইজ আর সার মাটির অনুপাত ঠিকঠাক নিলে হার্ডি বা ট্রপিক্যাল ভ্যারাইটি যাই হোক না সব ভ্যারাইটিই ভালো ফুল দেয়। কোন ভ্যারাইটির জন্য কি সাইজের গামলা নেবেন আর কিভাবে মিডিয়া তৈরি করবেন আপনার সেলারের থেকে জেনে নিন। আমি আমার কাস্টমার দের গাইড করে দি , মোটামুটি সবাই ভালো ফুল পায়।

     ভ্যারাইটি হিসাবে গামলার সাইজ কি নেবেন আর কীভাবে মিডিয়া বানাবেন এটার লিস্ট চাইবেন না। দিতে ইচ্ছুক নই এমন না , দেওয়া সম্ভব না। কারণটা এবার বলছি।

     একটা ভ্যারাইটির ফুল থেকে রেনু নিয়ে অন্য ভ্যারাইটির ফুলের সাথে কৃত্রিম পড়াগমিলন করে যে বীজ তৈরি হয় ওটা থেকে গাছ বড়ো করলে হতে পারে একটা নতুন ভ্যারাইটি পেয়ে গেলেন। এটার পদ্ধতি এতটাই সোজা যে হাতে কলমে দেখাতে ঠিক গুনে গুনে পাঁচটা মিনিট লাগবে একটা ক্লাস সেভেন এর বাচ্চাকে একবার দেখিয়ে দিলে সেও করে ফেলবে । আর পদ্মের বীজ খুব সহজেই হয়।

     হাইব্রিড তৈরির প্রধান চ্যালেঞ্জ মাদার আর ফাদার হিসাবে কোন দুটো ভ্যারাইটি নেবেন সেটা ঠিক করা, সব ভ্যারাইটি ভালো মাদার হয় না, সব ভ্যারাইটি ভালো ফাদার হয় না । যেহেতু অধিকাংশ ভ্যারাইটি পিওর না , তাই কোন বীজে কোন ঘুমিয়ে থাকা জিন সক্রিয় হয়ে উঠবে এটা আগে থেকে জানা যায় না। একই সিডপড এর তিনটে বীজ থেকে করা গাছের ফুল তিনরকম হতে পারে আবার অবিকল মা গাছের মতো হতে পারে.... ফুল না হওয়া পর্যন্ত জানতে পারবেন না যে কীরকম ফুল হবে।

    এই কারণেই বীজের গাছে কোনো গ্যারান্টি নেই যে গাছ বড়ো হলে ফুল কেমন হবে। কন্দ বা রাইজম থেকে গাছ করলে একদম নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে মা গাছের মতোই ফুল দেবে। তাই প্রথম বার গাছ করলে অবশ্যই কন্দ বা রাইজম থেকে গাছ করুন , বীজ থেকে না।

    এইবার ধরুন , একজন কেউ পদ্মের হাইব্রিড বানানোর চেষ্টা করলো , যেটা অনেকেই করে যেহেতু পদ্ধতি টা খুব সোজা।  গাছে এই পদ্ধতিতে বীজ হলো , বীজ থেকে গাছ হলো , কিন্তু ফুল যখন ফুটলো সেটা মা গাছের থেকে খুব সামান্য আলাদা । এতটাই সামান্য পার্থক্য যে খুব ভালো করে লক্ষ্য না করলে বোঝা যায় না। 

     এখন এটাকে নতুন ভ্যারাইটি বলে বাজারে ক্লেম করা যাবে না , কিন্তু অনেকেই যেটা করে এই গাছের টিউবার অরিজিনাল মা গাছের টিউবার বলে চালিয়ে দেয়। এখন এই টিউবার থেকে গাছ করলে সেটা মা ভ্যারাইটির মত দেখতে ফুল দিলেও অন্য প্রপার্টি গুলো যেমন ফুলের সংখ্যা , সেনসিটিভিটি, লেট ব্লুমিং ক্যাপাসিটি অনেক কিছুই মা গাছের থেকে আলাদা হয়ে যায় ।

      হাইব্রিড তৈরির পদ্ধতিতে অনেক সময় জেনেটিক ডিফর্মমিটি চলে আসে। কারো কারো গ্রীন অ্যাপল ভীষণ সেনসিটিভ , একটুতেই মরে যায়। আবার কারো কাছে খুব সহজেই হয় , প্রচুর ফুল দেয় আর অনেক দিন পর্যন্ত ফুল দেয়। কারো গ্রিন অ্যাপল টিউবার দিতেই চায় না , আবার কারো কাছে মোটা মোটা টিউবার দেয়।

     মনে হয় বোঝাতে পারলাম ভ্যারাইটি হিসাবে গামলার সাইজ কি নেবেন আর কীভাবে মিডিয়া বানাবেন এটা আমি বলতে পারবো একমাত্র সেই রাইজম গুলোর ক্ষেত্রে যেগুলোর মাদার গাছ আমার নিজের বাগানে আছে। আপনার সেলারের কাছে কোনো ভ্যারাইটির কোন সাব ভেরিয়েন্ট আছে , সেটা আমার পক্ষে বোঝা কোনোমতেই সম্ভব না। আর আজকাল সবাই সেলার ।

    তাহলে বুঝবেন কি করে যে আপনার কাছে সবথেকে ভালো ভ্যারাইটি টা আছে? নামিদামি পাঁচজন সেলার এর থেকে পাঁচটা একই ভ্যারাইটির রাইজম কিনুন , গাছ করে দেখুন কোনটা সবথেকে ভালো , তারপর ভালোটা রেখে দিন।
      এটাই একমাত্র উপায় , কিন্তু সবার পক্ষে এই মেথড ফলো করা সম্ভব না , কারণ অনেকটা সময় নষ্ট , টাকা নষ্ট।

   আমি এই পদ্ধতিতেই ভালো গাছ কালেক্ট করি , কারণ এটাই আমার ভালোলাগার জায়গা আর রাইজোম সেল করে আমার গাছ করার খরচ উঠে আসে। পাঁচটা গাছের মধ্যে চারটে ফেলে দিলেও আমার গায়ে লাগে না।

     কি সাইজের গামলায় বসালে সবথেকে ভালো ফুল দেবে সেই হিসাবে দেখতে গেলে পদ্মের ভ্যারাইটিগুলো মোটামুটি তিনটে ভাগ করা যায়। মাইক্রো, বোল , মিডিয়াম আর লার্জ। মাইক্রো মানে যেগুলো ধরুন ৬-৮ ইঞ্চি গামলায় ভালো ফুল দেয় , বোল মানে যেগুলো ধরুন ১০-১৬ ইঞ্চি গামলায় ভালো ফুল দেয় , মিডিয়াম মানে যেগুলো ধরুন ১৮-২২ ইঞ্চি গামলায় ভালো ফুল দেয়, আর লার্জ মানে ২২ ইঞ্চির থেকে বড়ো জায়গা লাগে।
      এখন এই ভাগটার কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই। মানে কেউ যেটাকে বোল বলে অন্য আরেকজন সেটাকে হয়তো মিডিয়াম বলে । তবে মোটামুটি একটা আইডিয়া দেওয়ার জন্য রেঞ্জ গুলো বললাম।

     মাইক্রো ভ্যারাইটি যদি ২২ ইঞ্চি পটে বসান , ফুল দেবে না , বা অনেক অনেক দেরি হবে ফুল আসতে। লার্জ ভ্যারাইটি ৬-৮ ইঞ্চি পটে বসালে ফুল নাও পেতে পারেন।

এরপর কিছু আছে মনসুন ব্লুমার , মানে বৃষ্টির জল না পেলে ওনারা ফুল দেবে না। এরকম ভ্যারাইটি মার্চে বসালে জুলাই পর্যন্ত শুধু পাতা দেখে কাটাতে হবে ।

     আপনাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়তো বলে ফেললাম। তবে যেহেতু জলের গাছ নিয়ে বই লিখছি তাই যা জানি সব এক একটা পোস্টে এক জায়গায় করছি।

    এসব পড়ে ঘাবড়াবেন না। পদ্মের মতো সহজে হয় আর বিনা ঝঞ্ঝাট এর গাছ আমি দেখিনি। ঠিক সাইজের পটে ঠিক ভাবে মিডিয়া তৈরি করে বসিয়ে দিলে ৪৫ দিনের মধ্যে ফুল চলে আসবে । কিন্তু কোনটা ঠিক সাইজের পট , আর ঠিক মিডিয়া কি সেটাই একটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। যার গাছের কন্দ একমাত্র সেই বলতে পারবে।

    অনেকেই অন্য সেলার এর থেকে গাছ নিয়ে ফুল না পেয়ে আমাকে মেসেজ করেন , বাধ্য হয়ে "জানি না" বলতে হয়। অনেকেই অহংকারী মনে করেন , অনেকেই ভাবেন আমার থেকে গাছ নেননি বলে হয়তো গাইড করছি না। কিন্তু ঘটনা হলে কারো পক্ষেই অন্য কারো কন্দ থেকে গাছ এর ব্যাপারে কিছু বলা সম্ভব না। যাঁরা বলে তারা এই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় গুলো জানেন না ।

    এক্সচেঞ্জ এর গ্রুপগুলো থেকে বা কোনো গ্রুপ ইভেন্ট থেকে পাওয়া কন্দ থেকে গাছ করে ফুল না পেলেও অনেকে হেল্প নিতে মেসেজ করেন । এনাদের ভ্যারাইটির নাম জিজ্ঞেস করলে বলেন "গিফট পাওয়া"। মিনিমাম ভ্যারাইটির নাম না জানলে কি গাইড করবো বলুন? 

     ফেসবুকে অনেক রকম মানুষ আছেন। একজন গাইডেন্স চেয়ে মেসেজ করার পর আমি "জানি না" বলাতে মেসেজই গালাগালি শুরু করে দিয়েছিলেন ... "অহংকারী" , "বলুন , কতো টাকা নেবেন হেল্প করতে " , "এই জ্ঞান নিয়েই স্বর্গে যাবেন, কারো কোনো কাজে লাগবে না" এইসব ! 

লোকের ভালো করতে যাওয়ারও সমস্যা আছে অনেক। আমার জানা না থাকলে "জানি না" বলার শিক্ষাই ছেলেবেলা থেকে পেয়েছি... আটত্রিশ বছর বয়সে দুম করে অভ্যাস বদলে ফেলতে পারবো না।  ভুলভাল বলে দিতে সাহস লাগে না , "জানি না" বলতে কিন্তু যথেষ্ট সাহস লাগে।

পরের পর্বে ওয়াটার লিলির ভ্যারাইটি গুলো নিয়ে লিখবো।সম্ভব হলে পোস্টটা শেয়ার করবেন, কিছু মানুষের উপকার হবে, তবে আসল কথাটা হলো এটা করতে আপনার একটা সেকেন্ড লাগবে কিন্তু আমার অনেকটা উপকার হবে।

© গাছপাকা

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ ছবিতে দেখা যাচ্ছে পেয়ারার ফলের ভেতরের অংশ কালো হয়ে পচে গেছে এবং...