Thursday, December 28, 2023

জলবাগানে হতেখড়ি পর্ব - ৩ - অঙ্গন আমার প্রকৃতি

পদ্ম আর ওয়াটার লিলি নিয়ে আগের দুটো পর্বে বেশ খানিকটা ধারণা হয়ে গেছে আপনাদের। অন্তত এইটুকু জেনে গেছেন যে দুটোই খুব সহজে হয়, গাছ বসানোর এক মাসের মধ্যে ফুল চলে আসে আর বাড়ির ছাদে, বারান্দায় সব জায়গাতেই করা সম্ভব। 
       লক্ষ্মী ঠাকুরের হাতে থাকে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন পদ্ম ফুল বাড়িতে থাকা শুভ।হিন্দু ধর্মে পদ্ম আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। ধ্যান এর সময় হৃদপদ্মের ধ্যান করেন অনেকে । দুর্গা পূজা পদ্ম ছাড়া অসম্পূর্ণ।

       যাইহোক ,আগের পর্বে পদ্মের ভ্যারাইটি গুলো নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। ওটা না পড়ে থাকলে একটু দেখে নেবেন।আমার পেজে স্ক্রল করলেই পেয়ে যাবেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বলা আছে ওখানে।

      আজ বলবো পদ্ম গাছ বসাবেন কিভাবে? 

 👉 পট নির্বাচন 

           মাটির পট হলে সবথেকে ভালো , সিমেন্ট এর পটেও খুব ভালো গাছ হয়। সব সাইজের পটে সব ভ্যারাইটি ভালো হয় না। তাই হয় ভ্যারাইটি হিসাবে পট কিনুন বা পট হিসেবে
ভ্যারাইটি নিন। কোন ভ্যারাইটি কি পটে সবথেকে ভালো হয় , এটা যার থেকে রাইজম নেবেন তার থেকে জেনে নেবেন। এক একটা ভ্যারাইটির অনেক সাব ভ্যারাইটি হয় , আগের পর্বে আলোচনা করেছি , আপনারটি কোন সাব ভ্যারাইটি যার গাছ একমাত্র সেই বলতে পারবেন।

      কফি খাবার কাপ থেকে শুরু করে মিষ্টির মালসা , বারো ইঞ্চি ছোটো গামলা ,পঁচিশ লিটারের বালতি , আঠারো ইঞ্চি গামলা , বাইশ ইঞ্চি গামলা , চার ফুটের সুইমিং পুল , চৌবাচ্চা সব জায়গাতেই পদ্ম গাছ করেছি , সব জায়গাতেই এক মাসের মধ্যে ফুল পেয়েছি। তাই দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি , জায়গা হিসাবে ভ্যারাইটি নিলে ফুল পেতে কোনো সমস্যা হবে না।

     মাটির বা সিমেন্ট এর বড়ো পট অনেকটা ভারী হয়ে যায় , রিপট করার সময় অনেক সমস্যা হয় , তাই অনেকেই প্লাস্টিক এর গামলাতে পদ্ম গাছ করতে পছন্দ করেন। প্লাস্টিক এর গামলা অনেক হালকা ও হয়। কিন্তু গাছ সবথেকে ভালো হয় মাটির বা সিমেন্টের জায়গায় কারণ এগুলো রোদ পড়লেও চট করে গরম হয় না।

    প্লাস্টিক এর গামলা তে গাছ করতে চাইলে অবশ্যই নাইলনট এর কালো গামলা গুলো কিনবেন। এগুলোর দাম কম প্লাস রঙিন গামলা গুলোর মতো রোদ পড়লেও নষ্ট হয় না। 
     জলের গাছ শিকড়ে আলো পছন্দ করে না, তাই ট্রান্সপারেন্ট গামলা কিনবেন না, ওতে গাছ ভালো হবে না।

     যেহেতু এগুলো জলের গাছ , তাই নিচে ফুটো করার কোনো দরকার নেই।

    পদ্মের পট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা দুটো সংখ্যা বলি যেমন ধরুন ১৮/১০ , এর মানে আঠারো ইঞ্চি ব্যাস/ ডায়ামিটার আর দশ ইঞ্চি গভীরতা।  ভ্যারাইটি হিসেবে ব্যাস আর গভীরতা দুটোই ম্যাটার করে।

     পদ্ম গাছ কোনা জায়গা পছন্দ করে না। তাই চারচৌকো জায়গায় পদ্ম গাছ বসাবেন না। গাছের বাড়তে সমস্যা , সাথে রিপট করার সময় রইজম এর আকৃতি খুব বাজে হয়। চেষ্টা করবেন যাতে গোলাকার পাত্রে  গাছ বসানো যায়।

    সিমেন্ট এর চৌবাচ্চা তে গাছ করলে কোনাগুলো গোল করে নেবেন, অনেক বেটার গাছ হবে।

👉 মিডিয়া তৈরি 

      বেলে মাটি বাদে যেকোনো মাটিতে পদ্ম গাছ হয়। জলে ভেজা মাটি হাতের মুঠোতে নিয়ে মুঠো খুললে যদি মাটি আলগা হয়ে ঝরে পড়ে জেনে রাখবেন ওই মাটিতে ভালো গাছ হবে না। এঁটেল মাটি বা দোআঁশ মাটি হাতের কাছে যে মাটি পাবেন তাতেই গাছ করুন।
       শুধু নার্সারী থেকে সার দেওয়া মাটি কিনবেন না , ওগুলোতে কি থাকে আর কি থাকে না ভগবান ও জানে না। যারাই এই মাটিতে গাছ করার চেষ্টা করেছেন , কারোই ভালো গাছ হয়নি।

        অনেকের মনেই ভুল ধারণা পুকুরের পাক মাটি ছাড়া পদ্ম গাছ হয় না ।কথাটা ঠিক না । আমার একটা গাছও পাক মাটিতে করা নেই, খুব খারাপ গাছ হয়নি আমার।

       নিঃসন্দেহে পাক মাটিতে পদ্ম গাছ ভালো হয় , তবে সেক্ষেত্রে মাটি তুলে রোদে শুকিয়ে তারপর ব্যবহার করতে পারলে ভালো। অনেকেই দেখেছি পাক মাটিতে রাইজম লাগিয়ে গাছ পচিয়ে ফেলেছে। তাই পাক মাটি ব্যবহার করতে হলে সাবধানে করুন।

       চাষের জমির মাটিতে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার মিশে থাকে । এই মাটিতে অনেক সময় রাইজম পচিয়ে দেয়। সম্ভব হলে এই মাটি এড়িয়ে চলুন।

       যদি কোনো কারণে চাষের জমির মাটি বা পুকুরের পাক মাটি ব্যবহার করতেই হয় তাহলে কোনো অভিজ্ঞ জলবাগানির গাইডেন্স নিয়ে করুন।তাকে রেগুলার আপডেট দিন , সমস্যা দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে একশন নিন। 

   পতিত জমির মাটি, মানে যে জমিয়ে দীর্ঘদিন চাষবাস হয়নি সেরকম জমির মাটি সবথেকে নিরাপদ পদ্ম গাছের জন্য । কাছাকাছি বন জঙ্গল থাকলে সেখানকার মাটিও নিতে পারেন , এই মাটিতে এতো পরিমাণে জৈব পদার্থ মিশে থাকে যে গাছ খুব সুন্দর হয়।

     অনেকেই বলে গামলার একদম নিচে ২০% সার ( গোবর সার বা ভার্মি কম্পোস্ট) , তার ওপর ৫০% মাটি আর একদম ওপরে ৩০% জল এইভাবে মিডিয়া করলে সবথেকে ভালো গাছ হয়। এই অনুপাত অনেক বছর ধরেই চলে আসছে।

     এতে গাছ হয় , কিন্তু এভারেজ গাছ হয় , এভারেজ ফুল হয়। একটাই কারণ , সব ভ্যারাইটির সার এর প্রয়োজন সমান না। কোনো ভ্যারাইটি একটু বেশি খায় , কোনো ভ্যারাইটি একটু কম খায়। 

       খাদ্যের প্রয়োজন বুঝে সার এর পরিমাণ ঠিক করলে একই পটে একই ভ্যারাইটি অনেক বড়ো ফুল দেবে অনেক বেশি ফুল দেবে আর অনেক বেশিদিন ধরে ফুল দেবে।

   অনেকেই পোস্ট করেন , চার পাচটা ফুল দিয়েই গাছ ঘুমিয়ে পড়েছে । এরকম হয় যদি ভ্যারাইটি হিসেবে পট সাইজ খুব ছোটো বা খুব বড়ো হয়ে যায়। সার খুব কম বা সার খুব বেশি হয়ে গেলেও এটা হয়।

২০:৫০:৩০ এই রেশিও তে গাছ করা আর সব পরীক্ষায় চল্লিশ পেয়ে পাস করা একই জিনিস। তবে হ্যা , এই নিজে নিজে গাছ করলে এই রেশিওতেই ১৮/১০ পটে গাছ করুন , মোটামুটি সব ভ্যারাইটি এই পট সাইজে ,এই রেশিও তে ফুল দেবে। ফেল করার থেকে চল্লিশ পেয়ে পাস করাটা ভালো।

   গোবর সার এ খুব ভালো গাছ হয় । নিজের এক্সপেরিইয়েন্স না থাকলে বা অভিজ্ঞ কারো গাইডেন্স এ গাছ না করলে কাঁচা গোবর সার এড়িয়ে চলুন। অন্তত এক বছরের পুরানো শুকনো গোবর সার নিন, এটা অনেক নিরাপদ গাছের জন্য। ভার্মিকম্পোস্ট এও সুন্দর গাছ হয়। 

   এরপর ভ্যারাইটি হিসাবে পরিমাণ মতো হিউমিক এসিড, সি উইড, স্টিমড বোনডাস্ট, অল্প নিমখোল এসব দিতে পারেন। গাছ বসানোর সময় রাসায়নিক সার না দেওয়াই ভালো বা দিলেও খুব বুঝেশুনে।
      আমার থেকে যারা রাইজম নেন, আমি ভ্যারাইটি হিসাবে  কোনটা কি পরিমাণে দেবেন গাইড করে দিই।

     গাছ বড়ো হলে যেকোনো ব্যালান্সড NPK যেমন ২০:২০:২০ বা ১৯:১৯:১৯ , আর প্রয়োজন বুঝে DAP, লাল পটাশ , এপসম সল্ট দিতে পারেন। ইউরিয়া ব্যবহার না করাই ভালো। 
     একটা কথা জানিয়ে রাখি শুধু পুরানো গোবর সার বা ভার্মি দিয়েও সুন্দর গাছ হয়। তাই এগুলো হাতের কাছে না না থাকলে আতঙ্কিত হবেন না। যেকোনো রাসায়নিক সার প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে গেলে মাটি নষ্ট করে দেবে , গাছ নষ্ট করে দেবে। তাই ব্যবহার করতে হলে ভালোভাবে জেনে বুঝে তারপর করবেন।

     গাছের পাতা দেখে , গাছের বয়স হিসেবে গাছের গ্রোথ দেখে বোঝা যায় গাছের এই মুহূর্তে কি ধরনের খাবারের প্রয়োজন। এই জিনিসটা লিখে বোঝানো যায় না, এই সেন্স টা একদিনে আসবে না। একই ধরনের গাছ বছরের পর বছর করতে থাকলে ধীরে ধীরে আপনিও বুঝতে পারবেন।

     যতোদিন না সেই সেন্স টা আসে , যেকোনো রাসায়নিক সার গাছে দেওয়ার আগে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিয়ে করুন। আমাদের শুধু জলের গাছের একটা গ্রুপ আছে,ওখানেও ছবি পোস্ট করে পরামর্শ চাইতে পারেন।

    ভ্যারাইটি হিসাবে সঠিক সাইজের পট নিয়ে ঠিকঠাক মিডিয়া বানিয়ে একবার গাছ বসিয়ে দিতে পারলে সারা বছর আর কোনো টেনশন থাকে না। সপ্তাহে এক দুবার জল দিলেই গাছ বিন্দাস থাকবে আর ফুল দিয়ে যাবে।

   পরের পর্বে রাইজম কিভাবে বসাবেন সেটা নিয়ে আলোচনা করবো।

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ

পেয়ারার ফলের সমস্যা: ফলমাছি (Fruit Fly) ও ফল পচা রোগের আক্রমণ ছবিতে দেখা যাচ্ছে পেয়ারার ফলের ভেতরের অংশ কালো হয়ে পচে গেছে এবং...